ধর্মেন্দ্র ভট্টাচার্য : পূর্ব বর্ধমানের আউশগ্রামের উত্তর রামনগর গ্রামের বাসিন্দা অবসর প্রাপ্ত শিক্ষক সদাই ফকির, তার পোশাকি একটা নাম সুজিত চট্টোপাধ্যায় আছে বটে কিন্তু এলাকার মানুষ সবাই চেনে সদাই ফকির নামে। তার পাঠশালাটির নামও দিয়েছেন সদাই ফকিরের পাঠশালা।
সালটা ২০০৪। শিক্ষকতা থেকে অবসর নেবার পর অবসর সময় কি ভাবে পার করবেন এই চিন্তাতেই যখন অস্থির হয়ে উঠেছিলেন ঠিক সময় তিনি আবার তার পুরোনো স্কুলে গেলেন বিনাপয়সায় শিক্ষকতা করবেন বলে কিন্তু স্কুল থেকে অনুমতি পেলেন না। স্কুল থেকে বিষণ্ণ মনেই ফিরে এলেন। এভাবে বেশ কিছুদিন চলার পর,একদিন অনেক দূরের জঙ্গলে ঘেরা গ্রাম থেকে কয়েকটি বার ক্লাসের ছাত্রছাত্রী আসে টিউশন পড়ার জন্য। হাসি ফুটে ষাট বছরের বৃদ্ধর মুখে, মনে মনে ভাবেন এই তো আমি চেয়েছিলাম। এককথায় রাজি হয়ে যান। ছাত্ররা টিউশন ফ্রী জানতে চায়। সুজিত বাবু উপলব্ধি করেছিলেন এদের সামর্থ না থাকলেও এরা অনেকগুলি টিউশন পড়ে তাতে যথেষ্ট টাকা খরচ হয়। তিনি হেসে তাদের বলেন তাকে মাসে ২ টাকা করে দিতে হবে তাও বছর শেষ হলে। কিরে পারবি তো? উত্তরে ছাত্র ছাত্রীরা খুশি হয়ে বলে ঠিক আছে স্যার, আপনাকে আমরাও চকলেটও খাওয়াবো। ব্যাস সেই শুরু টিউশনি পড়ানো। এখনো সত্তরোর্ধ মানুষটি তার মানুষ গড়ার পাঠশালাটি চালিয়ে যাচ্ছেন। বর্তমানে ছাত্র ছাত্রীর সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিনশ। এই মানুষটি এখনো ওই টাকা নিয়েই পড়িয়ে যাচ্ছেন।
টিউশন ফ্রী ২ টাকা কেন জিজ্ঞাসা করাতে তিনি জানান ২ টাকাটা গুরুদক্ষিনা। হেসে বলেন সামান্য হলেও গুরুদক্ষিণা নিতে হয়।
গুরুকুল শিক্ষা ব্যাবস্থায় বিশ্বাসী সুজিতবাবু একজন সমাজসেবীও। শুধু মাত্র প্রচারের জন্য সমাজসেবা করেন না। গোপনে সবার অন্তরালে তিনি লকডাউনের সময় তার এলাকার চাকরি হারা মানুষগুলির কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন খাদ্যসামগ্রী। সবটুকুই তিনি করেছিলেন নিজের পেনশনের টাকা থেকে। থ্যালাসেমিয়া রুগীদের পাশেও তিনি দাঁড়িয়েছেন। ছাত্রছাত্রীদের কাছে তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী দান আর নিজের পেনশনের টাকা থেকে এখনো তিনি থ্যালাসেমিয়া রুগীদের সাহায্য করে চলেছেন সদাই ফকির।
এ হেন মানুষটির কর্মকান্ডকে সম্মান দিল ভারত সরকার। তিনি এবারের পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত হতে চলেছেন।
এই খবর প্রকাশ পাবার পর সারা গ্রাম, জেলার মানুষ,শুভানুধ্যায়ীরা, ছাত্র ছাত্রীদের ভিড় আছড়ে পড়ছে সুজিত বাবুর বাড়িতে। চলছে মিষ্টি মুখ। এই সম্মান পাওয়াতে খুশি সদাই ফকিরও।
প্রচার বিমুখ মানুষ গড়ার এই কারিগরের সদর দরজার বাইরের প্রাচীরে লেখা আছে ' লিখে রেখো একফোঁটা দিলেম শিশির' -সদাই ফকির। মানুষ মনে রাখবে মাস্টার মশাই আপনাকে, অনুসরণ করবে ভবিষ্যৎ।



কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন